আমি প্রায় দেড় মাস পর বাবার বাড়িতে রাত জেগে সকালে একটু ঘুমানোর সুযোগ
পেলাম। খুব খুশি হয়ে বসে ছিলাম সারা রাত পড়বো আর ভোরে ঘুমাবো। কিন্তু না
কেমন যেন অভ্যাস হয়ে গেছে এশারের নামাজের কিছুক্ষণ পরই হাই আসতে লাগলো।
ইয়াসির অলরেডি বিছানা গুছানো শুরু করে দিয়েছে। খানিকটা ব্যঙ্গ করেই বললাম,
--এই তুমি এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাচ্ছ কেন? এখানে তো আর তোমার মা নেই, ভোরে উঠে নামাজ না পড়লে তোমাকে বকবে!
: প্রথমত নামাজ আমি মায়ের জন্য পড়ি না। হ্যা, মায়ের শাসন আমাকে নামাজে অভ্যস্ত হতে সহায়তা করেছে! আমি অধিকাংশ সময়ই শহরে থাকি সেখানেও আমি নামাজ কাজা করি না। সোমবার, বৃহস্পতিবার আর আরবি মাসের মাঝখানের সুন্নত রোজাগুলোও আমার বা আমাদের কাছে ফরজ রোজার মতো হয়ে গেছে।
-- বাবরে বাব! এত এত রোজা। কেমনে পার?
: কিছুটা অভ্যাসবশত হলেও মোটামোটি সুন্নতকে ভালোবেসেই রাখা।
--আসলে তোমার মা খুবই কঠোর।
ইয়াসির জাস্ট মুচকি হেসে বললেন,
: এত তাড়াতাড়ি নির্ণয় করে ফেললে? কিছুটা সময় না হয় যাক।
আমি এই ব্যপারে আর কথা বাড়ালাম না, উনি শাশুড়ী, গুরুজন। আমার পরিবার থেকে আমি এই শিক্ষা পাইনি। আমিও শুয়ে পড়লাম। তবে খুব ভাল লাগছে, অনেকদিন পর একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবো। ভোরে উঠার টেনশন নেই। ইয়াসিরের সাথে এটা সেটা বলতে বলতে অনেক রাত হয়ে যায় কিন্তু তাও কীভাবে যেন ফযরের আযানের সাথে সাথে ঘুমটা ভেঙেই যায়। কিন্তু ঘুমের জন্য চোখ খুলতে পারছি না৷ লক্ষ্য করলাম ইয়াসির বিছানায় নেই। আদা ঘুম, আদা জাগানোর মধ্যেই বললাম, কেমনে পারে?
যখন পরিপূর্ণ ঘুম ভাঙল দেখলাম ইয়াসির কোরান তেলওয়াত করছে।
খানিক রাগ দেখিয়ে বললাম,
--আমাকে ডাকনি কেন?
: ডাকলে তুমি উঠতে?
--না উঠলে পানি ঢেলে দিতে!
: না, আমি জোর করে তোমার কাছে কিছুই আশা করি না।
একটু আওয়াজ নিচু করে খানিকটা বিড়বিড় করে বললাম, তাই তো এখনো স্বামীর অধিকারটুকুও আদায় কর নি। নিজের বিয়ে করা বউ থেকেও দূরত্ব বজায় রাখ। একই বিছানায় থেকেও কত দুরত্ব।
আমি জানি সে শুনেছে তাও না শুনার ভান করে বললো,
: তুমি যা আদায় করবে ভালোবেসেই। মায়ের ভয়ে, অন্য কারণে নয়। আমার বিশ্বাস তুমি আমার রঙেই রাঙিয়ে যাবে যেটা আল্লাহর রঙ, ইসলামের রঙ।
আমি কথা না বাড়িয়ে ওয়াসরুমে চলে গেলাম।
আমরা দুই ভাই বোনের মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত বিশেষ করে ফজরের নামাজের অভ্যাস না হলেও মা ফজরের আগেই ঘুম থেকে উঠে যায়। এশরাকের সালাত আদায় করে সকালের নাস্তা রেডি করে।
ইয়াসিরসহ বাবার বাড়িতে যাওয়ার পর থেকে দেখতাম মা ফজরের সালাত আদায় করেই নাস্তা রেডি করছে। হয়তো ইয়াসির ভোরে উঠে বলেই।
ওমা ফ্রেশ হয়ে এসে দেখলাম ইয়াসির রুমে খাবার নিয়ে এসেছে। বললো,
: হা কর আমি খাইয়ে দিচ্ছি তুমি পড়া শুরু কর।
কাল পরীক্ষা রাতেও পড়া হয়নি।
কিছুটা অবাক হলেও বেশ ভালো লাগছে। বিয়ের আগে নিজের হাতে কয়বার খাবার খেয়েছি বোধহয় গুণে দিতে পারবো। হয় মা নয়তো বাবাই খাইয়ে দিত। একমাত্র এবং বড় মেয়ে হওয়াতে বাবা মায়ের সব আদর পুরোপুরি আমার ভাগেই ছিল। শ্বশুর বাড়িতে তো সবার সাথেই খেতে হয়েছে কিন্তু বাবার বাড়িতে প্রথমবারের মতো ইয়াসিরের এই স্নেহময়ী রুপ দেখে চোখের কোণায় পানি জমা হয়ে গেল। বাবা আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। মা সবসময় আক্ষেপ করে বলতো, "জানি না বিয়ের পরে তোকে এত যত্ন করে কে ভালোবাসবে? এখানে বাবার হাতে এত আদরে বড় হচ্ছিস না জানি শ্বশুর বাড়ি কেমন হয়?" মনের অজান্তেই অস্ফুটে বেরিয়ে এলো,
" বাবার রাজকন্যাটি এখন স্বামীর রাণী"
ইয়াসির কথাটি খেয়াল করে মুচকি হাসি দিয়ে বললো,
-- হয়েছে এত ব্যখ্যা দাড় করাতে হবে না পড়তে বস।
পরের দিন পরীক্ষা দিয়ে আসার সময় আবার সেই স্বাধীনচেতা বিন্দাস জিন্দেগী উপভোগ করার জন্য গাড়িতে না গিয়ে ইয়াসিরকে বলে রিক্সায় বসলাম। রিক্সার হুড ফেলে দিয়ে আইসক্রিম খেতে খেতে বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম। অনেক দিন পর বেশ মজা লাগছিল, ওই বাড়ি থেকে কয়েকবার দাওয়াত খেতে গিয়েছি, ওরে ইয়া বড় এক জোব্বা মতন বোরখা, পায়ে মোজা দেখতে পুরাই খালাম্মা। ইয়াক!
আমি তো অশালীন পোশাক পরি না। হিজাব, থ্রী পিস এতে কী প্রব্লেম বুঝি না। আসার সময় ইয়াসিরকে বলেই দিয়েছি,
-- আমি ওই জোব্বা পরতে পারবো না। প্লীজ জোর কর না৷ কথা রাখতে পারবো না।
ওর চেহারা খানিকটা মলিন হয়েছিল কিন্তু তা মুহুর্তের আবার মুচকি হাসি দিয়ে চুপ হয়ে থাকলো। সেদিন ওকে নিয়ে বেশ কয়েকটি সেলফি তুললাম। জামাইকে নিয়ে প্রথম ফবতে পিক আপলোড করবো বলে। এর আগেও বেশ কয়েকবার দিতে চেয়েও দেওয়া হয়নি। ওকে নিয়ে ছবি দিয়ে বান্ধবীদের কাছে বেশ ভাব দেখাতে পারবো। সে এতই আকর্ষণীয়, সুন্দর, সুঠাম দেহের অধিকারী। আর্মিদের মতো জিম করা পেটানো শরীর। ওর সাথে মানাতে হলে আমাকেও স্লিম থাকতে হবে যদিও ওদের বাড়ির তিন বউকে দেখলে এখনো অবিবাহিতই মনে হয়। এত সুন্দর ফিগার। খোঁজে খোঁজে সুন্দরীদেরকেই বাড়ির বউ করে এনেছে।
বাসায় এসে মোবাইল নিয়ে পিক আপলোড দিতে যাবো, সে কীভাবে যেন বুঝতে পেরে ঠিক সেই মুহুর্তেই বললো,
: সুমু কিছু কথা বলি? একটু মন দিয়ে শুনবে প্লীজ, তারপর না হয় মোবাইলের কাজ শেষ করিও।
-- হুম বল।
: আগে একটা হাদীস বলি?
রাসুল (স:) বলেন,
তিন শ্রেণীর মানুষের উপর জান্নাত হারাম করা হয়েছে:
১, যারা কোন প্রকার নেশাদ্রব্য পান বা গ্রহণ করে।
২, মাতাপিতার অবাধ্য ব্যক্তি।
৩, দাইউস। ঐ দাইউস ব্যক্তি যে তার পরিবারে পর্দা প্রথা চালু রাখেনি। পরিবারের সদস্য বেপর্দা চলাফেরায় বাধাও প্রদান করেনি।(মুসনাদে আহমাদ: ২/৬৯)
(৩)দাইয়ুস সম্পর্কে রাসুল (স:) বলেছেন,“ঐ ব্যক্তিকে দাইয়ুস বলা হয় যে তার পরিবারের অশ্লীলতা ও কুকর্মকে মেনে নেয়।” (মুসনাদ আহমদ, নাসাঈ)
(৪)এ ব্যক্তি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, “দাইয়ুস কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (নাসায়ীঃ ২৫৬২, মিশকাতঃ ৩৬৫৫)
-- আমি কুকর্ম বা অশ্লীলতা কি করছি?
প্রচণ্ড রাগের সাথে বললাম ।
: একটু অপেক্ষা কর, বলতেছি,
রাসুল (স:) বলেন,
যে মহিলা সাজসজ্জা করে, টিপ পরে, লিপস্টিক মেখে ,সুগন্ধী মেখে বাইরে বের হয়, বেগানা পুরুষকে আকর্ষণ করে ঐ মহিলা জেনাকারি যদিও সে এখনো জিনা করেনি (সহিহুল জামে-২৭০১, তিরমিয, আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ)।
প্রচণ্ড রাগের মাথায় বললাম,
-- তো, তুমি আমাকে জেনাকারি বলছো, তাই তো?
: আমি তো কিছুই বলিনি।
আমাকে পাশে বসিয়ে, অনেকটা জড়িয়ে ধরেই বললো, শোন সুমু,
: ধর, তুমি আমাদের ছবিটা আপলোড দিলে। এই যে আমার সুন্দরী বউটা, সাজগোছ করে তোমাকে আরো সুন্দর লাগছে। তোমাকে দেখে কত পুরুষ চোখের তৃপ্তি মেটাবে। কতজনে তোমাকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য করবে হয়তো কেউ কেউ কমেন্টে এসেও লিখে যাবে। এগুলো শুনতে তোমার নিশ্চয় ভালো লাগবে না। অথচ তুমিই তাদের সেই সুযোগ করে দিচ্ছ। নামাজ, রোজা না করলে আমরা একাই গুনাহগার হচ্ছি অথচ তুমি বেপর্দায় চললে তোমার পরিবারের কর্তা ব্যক্তিরা সহ আরো কতশত জনে গুনাহগার হবে তার কোন ইয়াত্তা নেই।
আমি, তোমার বাবা হবো দাইউসের গুনায় গুনাহগার। আর মানুষের হায়াত মউতের কোন ভরসা নেই, এই ছবি গুলা রেখেই যদি মরে যাই তাহলে যতদিন তোমার আইডি থাকবে গুনাহ হতে থাকবে।
--আরে আমি মারা গেলে তুমি আইডি ডিয়েক্টিব করে দিও। পাসওয়ার্ড দিয়ে দিব।(বিরক্ত হয়েই বললাম।)
: কিন্তু সুন্দর ছবি তাই কেউ যদি তোমার ছবি তোমার অজান্তেই প্রপিক হিসেবে ইউজ করে।
তাহলে তো আর ডিলিটেরও সুযোগ থাকবে না।
আমাদের সওয়াবের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেল কিন্তু গুনাহের পথ হয়তো কিয়ামত পর্যন্ত চালু থাকবে। ভাবতে পার কী ভয়াবহ ব্যপার!
-- আরে বাবা, গুনাহ হলে আমার হবে তোমার কি?
: আমার কী মানে? আমি তোমাকে মানা না করা বা সাপোর্ট করার কারণে আমি দাইউসের গুনাহয় গুনাহগার হবো। তাছাড়া হাদীসে আছে,
রাসুল (সা:) বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্বাধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, রাষ্ট্রনেতা তার প্রজাদের সম্পর্কে দায়িত্বশীল আর তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পুরুষ লোক তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন মহিলা তার স্বামীর ঘরের সার্বিক ব্যাপারে দায়িত্বশীলা, তাকে সেটার পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পরিচারক তার মালিকের সম্পদের সংরক্ষক, আর তাকে সেটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এক কথায় তোমরা সবাই দায়িত্বশীল আর সবাই জিজ্ঞাসিত হবে সে দায়িত্ব সম্পর্কে”। (বুখারী : ৭১৩৮; মুসলিম: ১৭০৫)
আর এইজন্য মা আমাদের সঠিকটা শিখানোর মানানোর চেষ্টা করেন। মা'ই হল আমাদের পরিবারের প্রধান।
---তাহলে আমি বোরকা, নিকাব ছাড়া পরীক্ষা দিতে গেলাম তখন মানা করনি কেন?
: কারণ ইসলাম এমন একটা ধর্ম যেটা কাউকে কোন বিধান চাপিয়ে দেয় না। ইসলামকে মন থেকেই, ভালোবেসে আদায় করতে হয়। ইসলামকে যদি তুমি অন্তর দিয়ে পালন না কর তাহলে তা আল্লাহর কাছে কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না।
আল্লাহ বলেন,
"দ্বিনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।
[সূরা বাকারা ২:২৫৬]"
আর সবকিছু বলার বা বুঝানোর সময় এবং সুযোগ থাকে। সময়, সুযোগ মতো বললেই আল্লাহর ইচ্ছায় অপর পক্ষকে মানানো যায়।
-- তোমার মা যে চাপিয়ে দেয়, বলা যায় জবরদস্তি করে।
: মায়ের ব্যপারটা তুমি ধীরেধীরে বুঝতে পারবে। আপাতত মাকে নিয়ে আমরা আলোচনা না করি কেমন?
সে বাচ্চাদের মত করেই সবকিছু বুঝায় আমার এত ভাল লাগে। শুধু শুনতেই ইচ্ছে করে।
.
চলবে,,,,,,,
--এই তুমি এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাচ্ছ কেন? এখানে তো আর তোমার মা নেই, ভোরে উঠে নামাজ না পড়লে তোমাকে বকবে!
: প্রথমত নামাজ আমি মায়ের জন্য পড়ি না। হ্যা, মায়ের শাসন আমাকে নামাজে অভ্যস্ত হতে সহায়তা করেছে! আমি অধিকাংশ সময়ই শহরে থাকি সেখানেও আমি নামাজ কাজা করি না। সোমবার, বৃহস্পতিবার আর আরবি মাসের মাঝখানের সুন্নত রোজাগুলোও আমার বা আমাদের কাছে ফরজ রোজার মতো হয়ে গেছে।
-- বাবরে বাব! এত এত রোজা। কেমনে পার?
: কিছুটা অভ্যাসবশত হলেও মোটামোটি সুন্নতকে ভালোবেসেই রাখা।
--আসলে তোমার মা খুবই কঠোর।
ইয়াসির জাস্ট মুচকি হেসে বললেন,
: এত তাড়াতাড়ি নির্ণয় করে ফেললে? কিছুটা সময় না হয় যাক।
আমি এই ব্যপারে আর কথা বাড়ালাম না, উনি শাশুড়ী, গুরুজন। আমার পরিবার থেকে আমি এই শিক্ষা পাইনি। আমিও শুয়ে পড়লাম। তবে খুব ভাল লাগছে, অনেকদিন পর একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবো। ভোরে উঠার টেনশন নেই। ইয়াসিরের সাথে এটা সেটা বলতে বলতে অনেক রাত হয়ে যায় কিন্তু তাও কীভাবে যেন ফযরের আযানের সাথে সাথে ঘুমটা ভেঙেই যায়। কিন্তু ঘুমের জন্য চোখ খুলতে পারছি না৷ লক্ষ্য করলাম ইয়াসির বিছানায় নেই। আদা ঘুম, আদা জাগানোর মধ্যেই বললাম, কেমনে পারে?
যখন পরিপূর্ণ ঘুম ভাঙল দেখলাম ইয়াসির কোরান তেলওয়াত করছে।
খানিক রাগ দেখিয়ে বললাম,
--আমাকে ডাকনি কেন?
: ডাকলে তুমি উঠতে?
--না উঠলে পানি ঢেলে দিতে!
: না, আমি জোর করে তোমার কাছে কিছুই আশা করি না।
একটু আওয়াজ নিচু করে খানিকটা বিড়বিড় করে বললাম, তাই তো এখনো স্বামীর অধিকারটুকুও আদায় কর নি। নিজের বিয়ে করা বউ থেকেও দূরত্ব বজায় রাখ। একই বিছানায় থেকেও কত দুরত্ব।
আমি জানি সে শুনেছে তাও না শুনার ভান করে বললো,
: তুমি যা আদায় করবে ভালোবেসেই। মায়ের ভয়ে, অন্য কারণে নয়। আমার বিশ্বাস তুমি আমার রঙেই রাঙিয়ে যাবে যেটা আল্লাহর রঙ, ইসলামের রঙ।
আমি কথা না বাড়িয়ে ওয়াসরুমে চলে গেলাম।
আমরা দুই ভাই বোনের মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত বিশেষ করে ফজরের নামাজের অভ্যাস না হলেও মা ফজরের আগেই ঘুম থেকে উঠে যায়। এশরাকের সালাত আদায় করে সকালের নাস্তা রেডি করে।
ইয়াসিরসহ বাবার বাড়িতে যাওয়ার পর থেকে দেখতাম মা ফজরের সালাত আদায় করেই নাস্তা রেডি করছে। হয়তো ইয়াসির ভোরে উঠে বলেই।
ওমা ফ্রেশ হয়ে এসে দেখলাম ইয়াসির রুমে খাবার নিয়ে এসেছে। বললো,
: হা কর আমি খাইয়ে দিচ্ছি তুমি পড়া শুরু কর।
কাল পরীক্ষা রাতেও পড়া হয়নি।
কিছুটা অবাক হলেও বেশ ভালো লাগছে। বিয়ের আগে নিজের হাতে কয়বার খাবার খেয়েছি বোধহয় গুণে দিতে পারবো। হয় মা নয়তো বাবাই খাইয়ে দিত। একমাত্র এবং বড় মেয়ে হওয়াতে বাবা মায়ের সব আদর পুরোপুরি আমার ভাগেই ছিল। শ্বশুর বাড়িতে তো সবার সাথেই খেতে হয়েছে কিন্তু বাবার বাড়িতে প্রথমবারের মতো ইয়াসিরের এই স্নেহময়ী রুপ দেখে চোখের কোণায় পানি জমা হয়ে গেল। বাবা আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। মা সবসময় আক্ষেপ করে বলতো, "জানি না বিয়ের পরে তোকে এত যত্ন করে কে ভালোবাসবে? এখানে বাবার হাতে এত আদরে বড় হচ্ছিস না জানি শ্বশুর বাড়ি কেমন হয়?" মনের অজান্তেই অস্ফুটে বেরিয়ে এলো,
" বাবার রাজকন্যাটি এখন স্বামীর রাণী"
ইয়াসির কথাটি খেয়াল করে মুচকি হাসি দিয়ে বললো,
-- হয়েছে এত ব্যখ্যা দাড় করাতে হবে না পড়তে বস।
পরের দিন পরীক্ষা দিয়ে আসার সময় আবার সেই স্বাধীনচেতা বিন্দাস জিন্দেগী উপভোগ করার জন্য গাড়িতে না গিয়ে ইয়াসিরকে বলে রিক্সায় বসলাম। রিক্সার হুড ফেলে দিয়ে আইসক্রিম খেতে খেতে বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম। অনেক দিন পর বেশ মজা লাগছিল, ওই বাড়ি থেকে কয়েকবার দাওয়াত খেতে গিয়েছি, ওরে ইয়া বড় এক জোব্বা মতন বোরখা, পায়ে মোজা দেখতে পুরাই খালাম্মা। ইয়াক!
আমি তো অশালীন পোশাক পরি না। হিজাব, থ্রী পিস এতে কী প্রব্লেম বুঝি না। আসার সময় ইয়াসিরকে বলেই দিয়েছি,
-- আমি ওই জোব্বা পরতে পারবো না। প্লীজ জোর কর না৷ কথা রাখতে পারবো না।
ওর চেহারা খানিকটা মলিন হয়েছিল কিন্তু তা মুহুর্তের আবার মুচকি হাসি দিয়ে চুপ হয়ে থাকলো। সেদিন ওকে নিয়ে বেশ কয়েকটি সেলফি তুললাম। জামাইকে নিয়ে প্রথম ফবতে পিক আপলোড করবো বলে। এর আগেও বেশ কয়েকবার দিতে চেয়েও দেওয়া হয়নি। ওকে নিয়ে ছবি দিয়ে বান্ধবীদের কাছে বেশ ভাব দেখাতে পারবো। সে এতই আকর্ষণীয়, সুন্দর, সুঠাম দেহের অধিকারী। আর্মিদের মতো জিম করা পেটানো শরীর। ওর সাথে মানাতে হলে আমাকেও স্লিম থাকতে হবে যদিও ওদের বাড়ির তিন বউকে দেখলে এখনো অবিবাহিতই মনে হয়। এত সুন্দর ফিগার। খোঁজে খোঁজে সুন্দরীদেরকেই বাড়ির বউ করে এনেছে।
বাসায় এসে মোবাইল নিয়ে পিক আপলোড দিতে যাবো, সে কীভাবে যেন বুঝতে পেরে ঠিক সেই মুহুর্তেই বললো,
: সুমু কিছু কথা বলি? একটু মন দিয়ে শুনবে প্লীজ, তারপর না হয় মোবাইলের কাজ শেষ করিও।
-- হুম বল।
: আগে একটা হাদীস বলি?
রাসুল (স:) বলেন,
তিন শ্রেণীর মানুষের উপর জান্নাত হারাম করা হয়েছে:
১, যারা কোন প্রকার নেশাদ্রব্য পান বা গ্রহণ করে।
২, মাতাপিতার অবাধ্য ব্যক্তি।
৩, দাইউস। ঐ দাইউস ব্যক্তি যে তার পরিবারে পর্দা প্রথা চালু রাখেনি। পরিবারের সদস্য বেপর্দা চলাফেরায় বাধাও প্রদান করেনি।(মুসনাদে আহমাদ: ২/৬৯)
(৩)দাইয়ুস সম্পর্কে রাসুল (স:) বলেছেন,“ঐ ব্যক্তিকে দাইয়ুস বলা হয় যে তার পরিবারের অশ্লীলতা ও কুকর্মকে মেনে নেয়।” (মুসনাদ আহমদ, নাসাঈ)
(৪)এ ব্যক্তি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, “দাইয়ুস কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (নাসায়ীঃ ২৫৬২, মিশকাতঃ ৩৬৫৫)
-- আমি কুকর্ম বা অশ্লীলতা কি করছি?
প্রচণ্ড রাগের সাথে বললাম ।
: একটু অপেক্ষা কর, বলতেছি,
রাসুল (স:) বলেন,
যে মহিলা সাজসজ্জা করে, টিপ পরে, লিপস্টিক মেখে ,সুগন্ধী মেখে বাইরে বের হয়, বেগানা পুরুষকে আকর্ষণ করে ঐ মহিলা জেনাকারি যদিও সে এখনো জিনা করেনি (সহিহুল জামে-২৭০১, তিরমিয, আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ)।
প্রচণ্ড রাগের মাথায় বললাম,
-- তো, তুমি আমাকে জেনাকারি বলছো, তাই তো?
: আমি তো কিছুই বলিনি।
আমাকে পাশে বসিয়ে, অনেকটা জড়িয়ে ধরেই বললো, শোন সুমু,
: ধর, তুমি আমাদের ছবিটা আপলোড দিলে। এই যে আমার সুন্দরী বউটা, সাজগোছ করে তোমাকে আরো সুন্দর লাগছে। তোমাকে দেখে কত পুরুষ চোখের তৃপ্তি মেটাবে। কতজনে তোমাকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য করবে হয়তো কেউ কেউ কমেন্টে এসেও লিখে যাবে। এগুলো শুনতে তোমার নিশ্চয় ভালো লাগবে না। অথচ তুমিই তাদের সেই সুযোগ করে দিচ্ছ। নামাজ, রোজা না করলে আমরা একাই গুনাহগার হচ্ছি অথচ তুমি বেপর্দায় চললে তোমার পরিবারের কর্তা ব্যক্তিরা সহ আরো কতশত জনে গুনাহগার হবে তার কোন ইয়াত্তা নেই।
আমি, তোমার বাবা হবো দাইউসের গুনায় গুনাহগার। আর মানুষের হায়াত মউতের কোন ভরসা নেই, এই ছবি গুলা রেখেই যদি মরে যাই তাহলে যতদিন তোমার আইডি থাকবে গুনাহ হতে থাকবে।
--আরে আমি মারা গেলে তুমি আইডি ডিয়েক্টিব করে দিও। পাসওয়ার্ড দিয়ে দিব।(বিরক্ত হয়েই বললাম।)
: কিন্তু সুন্দর ছবি তাই কেউ যদি তোমার ছবি তোমার অজান্তেই প্রপিক হিসেবে ইউজ করে।
তাহলে তো আর ডিলিটেরও সুযোগ থাকবে না।
আমাদের সওয়াবের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেল কিন্তু গুনাহের পথ হয়তো কিয়ামত পর্যন্ত চালু থাকবে। ভাবতে পার কী ভয়াবহ ব্যপার!
-- আরে বাবা, গুনাহ হলে আমার হবে তোমার কি?
: আমার কী মানে? আমি তোমাকে মানা না করা বা সাপোর্ট করার কারণে আমি দাইউসের গুনাহয় গুনাহগার হবো। তাছাড়া হাদীসে আছে,
রাসুল (সা:) বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্বাধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, রাষ্ট্রনেতা তার প্রজাদের সম্পর্কে দায়িত্বশীল আর তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পুরুষ লোক তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন মহিলা তার স্বামীর ঘরের সার্বিক ব্যাপারে দায়িত্বশীলা, তাকে সেটার পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পরিচারক তার মালিকের সম্পদের সংরক্ষক, আর তাকে সেটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এক কথায় তোমরা সবাই দায়িত্বশীল আর সবাই জিজ্ঞাসিত হবে সে দায়িত্ব সম্পর্কে”। (বুখারী : ৭১৩৮; মুসলিম: ১৭০৫)
আর এইজন্য মা আমাদের সঠিকটা শিখানোর মানানোর চেষ্টা করেন। মা'ই হল আমাদের পরিবারের প্রধান।
---তাহলে আমি বোরকা, নিকাব ছাড়া পরীক্ষা দিতে গেলাম তখন মানা করনি কেন?
: কারণ ইসলাম এমন একটা ধর্ম যেটা কাউকে কোন বিধান চাপিয়ে দেয় না। ইসলামকে মন থেকেই, ভালোবেসে আদায় করতে হয়। ইসলামকে যদি তুমি অন্তর দিয়ে পালন না কর তাহলে তা আল্লাহর কাছে কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না।
আল্লাহ বলেন,
"দ্বিনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।
[সূরা বাকারা ২:২৫৬]"
আর সবকিছু বলার বা বুঝানোর সময় এবং সুযোগ থাকে। সময়, সুযোগ মতো বললেই আল্লাহর ইচ্ছায় অপর পক্ষকে মানানো যায়।
-- তোমার মা যে চাপিয়ে দেয়, বলা যায় জবরদস্তি করে।
: মায়ের ব্যপারটা তুমি ধীরেধীরে বুঝতে পারবে। আপাতত মাকে নিয়ে আমরা আলোচনা না করি কেমন?
সে বাচ্চাদের মত করেই সবকিছু বুঝায় আমার এত ভাল লাগে। শুধু শুনতেই ইচ্ছে করে।
.
চলবে,,,,,,,
Comments
Post a Comment